বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ‘স্ল্যাব’ কৌশল: চাপে পড়বে ১ কোটি গ্রাহক, বিপাকে নিম্নমধ্যবিত্ত
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 12 May, 2026
দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে এবং ঘাটতি মেটাতে এবার অভিনব কৌশলের পথে হাঁটছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কেবল সরাসরি ইউনিট প্রতি দাম বাড়ানোই নয়, বরং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ বা ‘স্ল্যাব’ পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায়ের একটি বড় পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে মূলত দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।
পিডিবির প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গা হলো—আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের দ্বিতীয় ধাপটি। বর্তমানে কেউ ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য কম দাম (৫ টাকা ২৬ পয়সা) এবং পরবর্তী ১২৫ ইউনিটের জন্য দ্বিতীয় ধাপের দাম (৭ টাকা ২০ পয়সা) পরিশোধ করেন।
কিন্তু নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যদি কোনো গ্রাহক ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করেন, তবে তিনি আর প্রথম ধাপের সস্তা বিদ্যুতের সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ, ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহককে পুরো ২০০ ইউনিটের বিলই দিতে হবে দ্বিতীয় ধাপের উচ্চমূল্যে। এতে বিদ্যুতের দাম এক পয়সাও না বাড়ালেও কেবল ধাপ বদলের কারণেই একজন গ্রাহকের বিল বাড়বে ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।
পিডিবি শুধু ধাপ বদল করেই ক্ষান্ত হতে চায় না, একইসাথে দ্বিতীয় ধাপের বিদ্যুতের দামও প্রতি ইউনিটে ১ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। সব মিলিয়ে হিসাব করলে: বর্তমান বিল:১,২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা (২০০ ইউনিটের জন্য)। প্রস্তাবিত বিল: ১,৬৪০ টাকা (ধাপ বদল ও ইউনিট প্রতি দাম বৃদ্ধি মিলিয়ে)।
মোট বৃদ্ধি: প্রতি মাসে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।
পিডিবির নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর ফলে প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন, যার মধ্যে ১ কোটি গ্রাহকই হলেন নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির।
ভোক্তাদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পিডিবি এখন থেকে বছরে দুবার বা প্রতি ছয় মাস অন্তর বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের (অটোমেটিক ট্যারিফ) প্রস্তাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল বা কয়লার দাম বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের পকেট থেকে সেই টাকা কাটা হবে।
১ জুন থেকেই এই নতুন দাম কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
খরচ না কমিয়ে দায় চাপানো হচ্ছে ভোক্তার ওপর?
সরকার ও পিডিবি ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকটের দোহাই দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন খরচ কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। বিশেষ করে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, যা মূলত অব্যবস্থাপনার ফল।
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার বাজার দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে সৌর, গ্যাস এবং তেলচালিত বিদ্যুৎ কিনছে। সমালোচকদের মতে, নিজেদের ভেতরের লুণ্ঠন ও অদক্ষতা দূর না করে সেই ঘাটতি পূরণের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জনজীবনে প্রভাব
বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর: সেচ কাজ ও শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল, ডালসহ সব ধরনের পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা, নতুন করে বিদ্যুৎ বিল বাড়লে তাদের অন্যান্য মৌলিক চাহিদা কাটছাঁট করতে হবে।
আগামী ২০ ও ২১ মে বিইআরসিতে এ নিয়ে গণশুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কমিশন কেবল পিডিবির আর্থিক ঘাটতি না দেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ খাতের অপচয় রোধের বিষয়টি মাথায় রেখে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যথায়, এই বাড়তি বিলের বোঝা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

